পৃথিবী কা*দের

জন্য হুচ গাল্স

মনোজ বস্তু

৫বঙ্গল পাবালশাস ১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে ত্্রীট, কলিকাতা--১২ .

তুন্ীয় সংস্করণ-_ বৈশাখ, ১৩৫ প্রকাশক --শচীকআনাথ মুখোপা ধ্যা্স বেঙ্গল পাঁবলিশাল”

১৪১ বন্ষিম চাটুজ্জে স্ত্রীট প্রচ্ছদপট-পরিকল্পন1--

আশু বন্দযোপাধা।ন্ মুদ্রাকর-_-ঞশস্ভুনাথ বন্দ্যে।পাধ্যা মানসী প্রেস,

৭৩, মানিকতল। স্ীট,

কলিকাতা

রক প্রচ্ছদপট ফুদ্রখ--

ভারত ফোটোটাইপ ইঈনডিও বাধাই--:বঙ্গল_বাইগাস”

এক টাক? আট আন।

স্রীমুভাচজ্দ্র বস্তু

পৃথিবী কাদের ? স"ইবাবার গল্প ইয়াসিন মিঞা বন্দে মাতরম্‌ এরোপ্লেন

৯৭ ৪৭ ৬৫

৮৪

পৃথিবী কা*দের ?

একেবারে উঠানের উপরে বীজতল1 ; সেইখানে ধান বুনেছে। নৃতন বর্ষায় ধানচারা'র রঙ হয়েছে মেঘের মতো! কালো। নটবর লাঙ্গল নিয়ে ক্ষেতে যাবার সময় দেখে, ক্ষেত থেকে কিরে এসে দেখে ; রাত্রিবেল। একঘুমের পর তামীক সেজে যখন দাওয়ায় বলে, তখনও বীজতলার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে

এরই মধ্যে একদিন সর্দি করে একটু জ্বর হয়েছে সৌদামিনীর | আর যাবে কোথায়? নটবর বলে, হু' হু'--বুঝতে পেরেছি ! ঘর তো! নয়_এ হয়েছে যেন তেতুলতল! বাইরের বৃষ্ট বন্ধ হয়, তেঁতুলতলার বৃষ্টি থামে না রোসো-

ক্রোশ পাঁচেক দূরে ভদ্রার ও-পারে পিশ-শ্বশুরের বাড়ি; তাদের অবস্থা ভাল। নটবর ছুটল সেখানে বলে, তিন কাহন খড় দিতে হবে গো পিশেমশাই মেয়ে তোমাদের নবাব-নদ্দিনী। গাঁয়ে ফোটা ছুই জল লেগেছে, সেই থেকে বিছানা নিয়েছেন_

_পিশে একটুখানি ইতস্তত করতে নটবর বলল, ডরাচ্ছ কেন গো ?

এই চারটে মাস দেরি কর-_তোমার এঁ তিন কাহনের জায়গায় আর এক

(পৃথিবী)--১

কাহনের বেশি দাম ধরে দেব। জমিদার এবার লকগেট করে দিয়েছে, আমার বাইশ বিঘে জমিতে সোনা ফলবে। আর কিছু ভাবনা করি?

ক্ষেতের কাজের ফাকে ফাকে নটবর মটকায় উঠে ঘর ছাঁয়। নিচে থেকে সৌদামিনী খড়ের আট ছুড়ে দেয়। খড় সে অবধি বড় পৌছায় না নটববের কাছেও যায় না, গড়িয়ে আবার নিচে এসে পড়ে। নটবর বলে, এই তোর হাতের ঠিক? কোন কামের ন'ন রে বউ, তোরা পারিস কেবল বেগুন কুটতে। তাক করে ফেল্‌ ধিকি-_

খুব মনোযোগের সঙ্গে বউ তাক করে। খড় পড়ে এবার চালের উপর: নয়__নটবরের পিঠের উপর |

উহ_ হু»"*এই?

বউ হেসে গড়িয়ে পড়ে। নটবরের ইচ্ছে করে, নেমে এসে এঁ পাগলীকে ধাক্কা মেরে জল-কাদার মধ্যে ফেলে দেয়। সেখানে গড়িয়ে গড়িয়ে হাস্থুক --যত পারে, হাস্ুক_

নৃতন ছাউনিতে ঘরখানা৷ ঝকমক করে। নটবর দাওয়ায় শোয়। রাতের বাতাসে ধানচারার নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পায়। লাল ভেরেগ্ডা- ঘেরা উঠানের ফালির মধ্যে গাদাগাদি হয়ে তারা৷ আর থাকতে চাইছে না, সীমাহীন বিলে যাবার জন্য অধীর হয়েছে। আপন মনে মাথা নেড়ে হাসিমুখে নটবর বলতে থাকে, সবুর, সবুর-_মাটি ভেঙে তোদের জন্য গদি তৈরি হচ্ছে। হয়ে যাক-_সব্বাইকে নিয়ে যাব _-সবুর-_

এক-একদিন ঘুমের ঘোরে নটবর চমকে ওঠে, মাঝরাতে বৃষ্টি নেমেছে» ঝড়ো বাতাসে জলের ছাট সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিয়ে যাঁচ্ছে। একটুখানি সরে সে আগুনের মালসার কাছে বসে। ভুড়-ভুড় করে হু"কো টানে, আর ভাবে _ সকালটা হলে হয়, উঃ কত রাত্রি এখনও !

র্‌

: বিছ্বানাট। বেড়ার দিকে টেনে নিয়ে আবার শুয়ে পড়ে। ঘুমোবার জো আছে ! তখনই ধড়মড় করে ওঠে। ফরসা তো প্রায় হয়েই গেছে জোরে জোরে সে দরজা ঝাঁকায়। ওঠ, শিগগির ওঠ, -ও বউ, মরে ঘুমুচ্ছিস নাকি? উঠে বৌদাটা ধরিয়ে দে না __

চোখ মুছতে মুছতে সৌদামিনী দরজা খুলল নটবর ততক্ষণে গোয়াল থেকে বলদ বের করেছে, লাঙ্গল কাধে নিয়েছে লৌদামিনী বলে, কি ভূত চাপল তোমার ঘাঁড়ে-_ছুই চোখ এক করতে পার না। রাত যে এখনো এক প"র বাকি-_

হু, রাত না হাতী! আকাশের দিকে চেয়ে নটবর কিন্তু একটু বেকুব হয়ে গেল। রাত. পোহায় নি সত্যি। চাদ জল-জবল করছে; মেঘ-ভাঙ জ্যোৎনস' দিনের মতো! লাগছে নটবর বলল, কি বুষ্টিটা হয়ে গেল! কিচ্ছু তো জানলি নে বউ, তুই তখন নীক ডাঁকছিলি। আমার ধানচারা আজ এক বিঘত বেড়ে গেছে।

নালা দিয়ে কলকল শব্দে জল বেরুচ্ছে নটবর হাঁল-গরু নিয়ে মাঠে নীমল। শখ করে বলদের গলায় ঘণ্টা বাধ! হয়েছে, ঘণ্টার ঠন-ঠুন শব ক্রমশ মিলিয়ে গেল। কাদায় ভতি উঠান পেরিয়ে ভেরেগার বেড়ার ধারে সৌদামিনী কতক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে আছে। .ভাবল, বেশ হয়েছে, আর শোব না, কাজ-কর্মগুলো এইবার সেরে রাখি। গোবর-মাটি দেওয়। হল, ঘর-দোর ঝাট হয়ে গেল, রাত আর পোহাতে চায় না তার কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল মানুষটি কি রকম হয়ে গেছে

_ ক্ষেত আর ক্ষেত! রাত-বিরেতে একল! একটি প্রাণী বেরিয়ে যায়, কত রকম দৌষ-দৃষ্টি পড়তে পারে, বুনো-শুয়োর কি সাপ-_

সাপের কথ! মনে হতে সৌদামিনী শিউরে ওঠে -আন্তিক্ত মুনের্মাতা-"' হে মা মনসা, রক্ষা কোরো-_

& ধানক্ষেতের উপরেই সাপের কামড়ে নটবরের বাপ মার! গিয়েছিল। সে অনেকদিনের কথা, আবাদের জঙ্গল সাফ হচ্ছিল... সৌদামিনী বাড়িতে আসে নি, নটবর তখন এক ফোটা শিশু। সেই সব কাহিনী নটবর যখন বলে, মৌদামিনীর চোখে জল এসে যায়।

এরই মধ্যে একদিন রান্নাঘরে বসে সৌদামিনী ক্ষেতে পান্তা পাঠাবার ব্যবস্থা করছিল, এমন সময় ঢোলের আওয়াজ শোন! গেল, ডুম-ডুম-ডুম্‌। তাড়াতাড়ি সে বাইরে এল। বাজনা আসছে মাঠের দিক থেকে রোদ ওঠে নি ভাল করে, এখন ঢোলের বাজনা-"*বিয়ে করতে যাবার সময় নয়,_-তা হ'লে বিয়ের পর বর-ক'নে ফিরে চলেছে ঠিক

মাঠের দক্ষিণে বাধাল, সেইখান দিয়ে কীচা রান্তা গিয়েছে ভোমরার ভদ্রপাড়ার দিকে সৌদামিনী দুষ্টি বিসারিত করে সেই দিকে তাকাল বিস্তর লোক নেখানে- চারো» দোয়াড়ি, ঘুণি পেতে নানা৷ উপায়ে মাছ ধর! হচ্ছে বর-ক'নের কোন পালকি কিন্ধ নজরে এল না।

লাঙ্গল-গরু নিয়ে একট, পরেই নটবর ফিরে আসছে।

একি? এরই মধ্যে ষে!

নটবর ম্লান হেসে বলল, কিছু না, ব্যস্ত হোঁস নে বউ--একটা! মাছুর দে দিকি-_

কি হয়েছে, বল ন| তুমি। বলদ ছুটোর দড়ি নিজের হাতে নিয়ে সৌদামিনী কাতর চোখে চাইল।

নটবর বলল, বড্ড মাথা ধরেছে, ক্ষেতে আর দাড়াতে পারলাম না।

দ্াড়াবার জো ছিল না সত্যি। সৌদামিনী বিছানা করে দিল; নটবর শুয়ে পড়ে সেই যে চোখ বুজল, সমস্তটা দিনের মধ্যে আর উঠল না__-খেলও না। সৌদামিনী বারবার গায়ে হাত দিয়ে দেখে, গায়ে কিন্ত জর নেই।

আরও কদিন কাটল এই রকম। নটবরের কি যে অসুখ, সব সময়ে শুয়ে শুয়ে থাকে ক্ষেতে ওদিকে বড় গোন লেগেছে-- প্রিয়নাথ, মদন, কাসেম আলি ওর! সব সকাল-সন্ধ্যা দু-বেলা চাষ জুড়েছে। ক"দিনের -বৃষ্টিতে ধানচারা আরও বেড়ে গেছে। তারপর আবার একদিন রাত্রিবেলা ঘুম থেকে উঠে নটবর ডাকতে লাগল, বউ, শিগগির ওঠ-উঠে বৌদাটা ধরিয়ে দে এট্র,

রাত দুপুরে নটবর ক্ষেতে যায়, ভোর না হতে ফিরে আসে। সৌদামিনী আর পারে না, হাত ছু-খানা ধরে একদিন জিজ্ঞাসা করল, কিছু হয়েছে তোমার? সত্যি কথাটা বল দিঁকি-__- |

কিছু না, কিছু না। নটবর কথাটা উড়িয়ে দেয়। রোদ লাগলে মাথা ধরে যে! রাতারাতি না চষে উপায় কি?

সন্ধ্যার পর সৌদামিনী ভাত বেড়ে দিয়ে সামনে আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছে। কেরোসিনের টেমি জলছে। ছু-চার গ্রাস মুখে দিয়ে নটবর ফিক করে হেসে উঠল। বলে, বউ, একেবারে যে মহা-মচ্ছব ব্যাপার ! রোজ রোজ তুই আরম্ত করলি কি? |

ব্যাপার গুরুতর বটে। ডাল এবং শাকের ঘণ্টের উপর খেজুর- গুড়ের পায়ম দিয়েছে সৌদামিনী গাই ছুইতে পারে ভাল। হরি চাট,জ্জের বেয়াড়া গরু কেউ সামলাতে পারে না, আজ লৌদামিনী ছুয়ে দিয়ে এসেছে সেখান থেকে ছুধ পেয়েছে, এবং ছুধ যখন পাওয়া গেল__-ঘরে গুড় রয়েছে--আগুনে একটু সিদ্ধ করা বই তো নয়! কিন্তু এত সব কৈফিয়ৎ দেবার মেয়ে সৌদামিনী নয়। সেবঙ্কার দিয়ে উঠল, দেখ, মানা করে দিচ্ছি-_আমি গিনি, আমার ঘর-সংসার। তুমি কেন আমার সংসারের কুচ্ছে। করবে?

হাসতে হাসতে নটবর বলে, আচ্ছা, আচ্ছা, আর করছি নে। কিন্তু একটা কাজ কর্‌ বউ, আগে আলোট! নিভিয়ে দে। মাছ নেই থে কাটা বেছে খেতে হবে। এত রোসনাই করলে লাটসাহেবও যে ফতুর হয়ে যায়!

সৌদামিনী তাড়া দিয়ে ওঠে, আবার !

হতাশ স্বরে নটবর বলে, বেশ, কিন্তু আবার যে কাল বলবি এক পয়সার কেরোসিন কেনো-_

কাল বলব না, পরশুও না। তুমিচুপ কর দিকি। অত বকবক করলে খেয়ে কখনো পেট ভরে !

বীশ-বাগানের ফাক দিয়ে উঠানে অস্পষ্ট জ্যোতন্না পড়েছে নটবর এক এক গ্রাস খায় আর ভাবে, নাঃ--মেয়েমানষের মতো! বেহিসাবি জাত আর নেই। এই তোটাদের আলো! পড়েছে, কি দরকার ছিল কেরোসিন পুড়িয়ে নবাবি করবার !

হঠাৎ কুকুর ডেকে ওঠে নটবর তীক্ষ দৃষ্টিতে পথের দিকে চাইল। সৌদামিনী বলে, কিছু না, তুমি খাও__

হাত গালে ওঠে না।

মৌদামিনী ব্যাকুলকণ্ঠে বলল, ওকি, উঠছ যে! শেয়াল-টেয়াল কি হয়তো যাচ্ছিল। তুমি বোসো, আমি দেখে আসছি_

টেমির কেরোসিন অকারণে ব্যয় হতে লাগল-_লাটসাহেবের অপব্যয়! কিন্তু নটবরের সেদিকে দৃষ্টি নেই। দূরের অন্ধকারের স্থাড়ি- পথের দিকে সে তাকিয়ে আছে।

ফুঃ ফুঃশ |

আলে! নিভিয়ে এক ঝটকায় সৌদামিনীর হাত ছাড়িয়ে সে অনৃশ্ঠ হয়ে গেল।

কাছারির মাণিক বরকন্দাজ উঠানে এসে দরাড়াল। এদিক-ওদিক উকি মেরে সে বলে উঠল, কোথায় গো?

বাড়ি নেই।

ভেগেছে?

পিড়ি টেনে নিয়ে ধীরে স্থস্থে মাণিক দীওয়ায় উঠে বসল। আপন মনে বকাবকি করে, আধারে ভূতের মতো! এসেও দ্রেখা পাবার জো নেই-_মান্ষ কম শয়তান হয়েছে আজকাল! তারপর সৌদামিনীকে বলে, আলে! জাল না গো, ভালমানষের মেয়ে-..এই তো জবলছিল এতক্ষণ

আলো! জেলে দিয়ে সৌদামিনী নিরুত্তরে রান্নাঘরের দিকে চলল

মাণিক হি-হি করে হেসে উঠল, তা৷ নটবরের দিনকাল যাচ্ছে ভাল; পিঠে-পায়েস__যেন যজ্ঞির বাড়ি। শোন গো লজ্জাবতী ঠাকরুন, নতুন হাঁড়ি নিয়ে এস-_-আর চাল-ডাল কাঠ-

সৌদামিনী ফিরে দীড়াল। মাণিক বলে, রান্না-খাওয়া আজকের এইখানে হবে। তারপর একট! মাছুর দিও, পড়ে থাকব হুজুরের দেখা তে। সহজে মিলবে ন।!

গোবরমাটি দিয়ে পরম যত্বে নিকানে! দাওয়া-_সিছুর পড়লে তুলে নেওয়া যায়। বলা নেই, কওয়া নেই--খন্তা এনে মাঁণিক নির্মমভাবে দাওয়া খুড়তে লাগল। সৌদামিনীর পাঁজরে যেন সেই খন্তার কোপ পড়ছে। তীক্ষকণ্ে প্রশ্ন করল, কি ইচ্ছে ?.

উন্ুন খুঁড়ছি। তুমি আর দীড়িও না গো, সিধের উধ্যুগ করগে__

ঘরের পিছনে বাঁশতলায় বড় উন্ন। শীতকালে খেজুর-রস জাল দেওয়। হয়; এখন ঝরা বাশপাতায় প্রায় ভতি হয়ে আছে। চারিদিকে আশশ্টাওড়া ভাটের জঙ্গল; উন্থুন বলে ধরবার জো নেই। সৌদামিনী নিচু হয়ে দু-হাঁতে বাশের পাতার স্তুপ তুলতে লাগল

বলি, বেঁচে আছ-_না সাপ-খোপে দয়া করেছে?

সাড়া পাওয়া যায় না।

তীস্ষুকে সৌদামিনী বলল, উঠে এস বলছি। তুমি চোর না ডাকাত-_ যে উচ্ননে সেঁদিয়ে থাকবে? বরকন্দাজ কি লাগিয়েছে দেখ, আমার ঘর-দোর খুঁড়ে তছনছ করছে।

নটবর ফিসফিস করে বলল, চুপ! মেজাজ দেখাস নে বউ, তিন বছরের খাজনা বাকি, জানিস ?

মাণিক হু'সিয়ার লোক, তারও এই রকম গোছের একটা সন্দেহ ছিল। মে কখন পিছনে এসে ্ীড়িয়েছে। বলে উঠল, কে রে? উন্ননের মধ্যে কথা বলে কে?

আতঙ্কে ঢুকে পড়! যত সহজ, বেরিয়ে আসা তেমন নয়। নটবর নানারকমে চেষ্টা করে। বলে, হবে, হয়ে যাবে...ও মাঁণিক ভাই, অত হাসছ কেন? মাজাটা বড্ড ধরে গেছে কিনা! বউ, কাধের এই এইখানটা-ধরে একটু টান দে দিকি***্যা জোর করে টান দে-_

অনেক কষ্টে সে বেরিয়ে এল। কাধের কাছে কেটে গেছে, বিছুটি লেগে সর্বাঙ্গ ফুলে ফুলে উঠেছে। একটুখানি হাসির মতো! ভাব করে নটবর ব্লল, উন্মুনটা সাফ করছিলাম মাঁণিক-ভায়া। কি রকম জঙ্গল

হয়েছে, দেখ মাঁণিক হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল। বলল, তবু ভাল। আমি ভাব- লাম বুঝি শেয়াল ঢুকেছে-_

ঘাড় নেড়ে নটবর বলে, তাই, ঠিক তাই-_শেয়াল-কুকুর ছাড়া কি! মানুষের ভয়ে শেয়াল গর্তে ঢোকে, আমরা গতে”ঢুকি তোমাদের ভয়ে।

নিজের রসিকতায় খানিক সে হা-হা করে হাসে। তারপর খপ

করে বরধন্দাজের হাত ছুটো জড়িয়ে ধক বলে, কাছারি গিয়ে বলোগে ভায়া, বাড়ি নেই। তোমার রোজ-গণ্ড পমন্ত দিয়ে দেব।

মাণিক হাত বাড়িয়ে বলে, দাঁও। আমার নগদ কারবার-_

আজ নয়, পরশু হাটে দিয়ে দেব। মাইরি--আজ একটা পয়সা; নেই। থাকে তো বাপের হাড়-__

বরকন্দাজ বলল, তবে হবে না, মনিবের হুন থেরে মিথ্যে বলতে পারব না। আজ আবার.ছোটবাবু এসেছেন সদর থেকে রেগে আগুন: হয়ে আছেন। চল--

দৃঢমুষ্টিতে তার হাত এটে ধরল।

ফাঁসির আসামীর মতো! নটবর কাছারির হলঘরে এসে দ্রাড়াল।

ছোটবাবু অল্পকথার মানুষ বললেন, মালিকের মাল-খাজনার দারে তোমার জমি নিলাম হয়ে গেছে

আজ্জে।

বয়নাম! জারি হয়েছে, ঢোল-সহরৎ হয়েছে

আজে হ্যা--

নায়েব একটা হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, চশমার ফাকে চেয়ে বললেন”. শুধু তাই নয় হুজুর, একদিন বরকন্দাজ দিয়ে লাঙল খুলে জমি থেকে তাড়িয়েও দিয়েছিলাম __ |

ছোটবাবু বললেন, অথচ শ্বনতে পাই রাত্তিরে রাত্তিরে জমি চষা হচ্ছে। বলি, মতলবটা কি?

নায়েব টিপ্লনি কাটলেন, মতলব বোঝাই যাচ্ছে হুজুর পেছনে ঠিক বঘুনাথ স। রয়েছে, এই বলে দিলাম। জমির দখল বজায় রাখছে।

ছোটবাবু বলতে লাগলেন, তোদের জন্যে আমি. সদরে ফৌজদাৰি

্ে

করতে যাব না। আসবার সময় কলকাতা থেকে একখানা ভাল হাণ্টার নিয়ে এসেছি তা-ই যথেষ্ট। দেখবি?

নটবর আকুল হয়ে কেদে উঠল, হুজুর বাধ ভেঙে তিন তিন বছর ক্ষেত ভাসিয়ে দিল-_পেটে খেতে পাই নি, খাজনা দেব কোখেকে?

সে ছোটবাবুর পা জড়িয়ে ধরল। |

এবার জমিতে বড্ড ভাল গোন; সোনা ফলবে, হুজুর। খাবার ধান যা যোগাড় ছিল, সমস্ত বীজতলায় ছড়িয়েছি। এইবারটা রক্ষে করুন ধর্মবাপ, সিকি পয়সা আর বাকি থাকবে না।

নায়েব ডাকলেন, শোন্‌, শোন্-_-এদ্িকে আয় নটবর। তোদের মায়াকান্ন শুনলে কি আর রাজ্যি রক্ষা করা যায়? আচ্ছা আচ্ছা". তামাক সাজ দিকি তোর ধানের চারা খুব ভাল হয়েছে- না?

হ্যা, বাবা

কত জমিতে বীজধান ছড়িয়েছিস ? কাঠা দশেক ?

বেশি হবে, বাবা।

ভাল ভাল। তাহলে সে-ই কোন্‌ না বিশ-কুড়ি টাকার ফসল ! মাণিক বরকন্দীজের দ্রিকে চেয়ে নায়েব বললেন, সব খবর তো কই 'আমাদের"কানে আসে না। |

নটবর হাত জোড় করে অস্পষ্ট স্বরে আবার কি বলতে গেল। নায়েব বললেন, হ্যা, হবে। ধানচারার একট! উপায় হবে বই কি ! তুই হুজুরের হুকুম নিয়ে চলে যা এখন।

ছোটবাবু বললেন, আচ্ছা যা কিন্তু জমি জমিদারের আর কোনদিন লাঙ্গল চষবি নে-_খবরদার !

ঘাড় নেড়ে নটবর বেরিয়ে এল। তারপর হেসেই খুন। জমি চধিস নাহ) বললেই হল! চষব না সোনা! হেন ধানের চারা বুঝি

১৩

'বীজতলায় শুকিয়ে মারব!..'নায়েব মশায় লোক মন্দ নয়, ওর ঘনে মনে দরদ আছে। ছোটবাবু আগে চলে যাক সদরে কাছারির কিছু পার্ধণী লাগবে, তা লাগুকগে-_ প্র

সৌদামিনী রাস্তা পর্যস্ত এগিয়ে এসেছিল জিজ্ঞাসা করল, কি হল?

কিছুঃ না» কিছু না, বাবু শিবতুল্য লোক__

সে জানি। তারপর আর্তকঠে সৌদামিনী বলল, জমি চষেছ 'বলে মারধোর করেছে কিনা, সেই কথাট! বল আমায়

মারধোর ? বাঃ রে

সত্রীর মুখের দিকে চেয়ে নটবর বিব্রত হয়ে উঠল। বলল, মগের মুল্লুক নাকি! সব কথা কে বলেছে শুনি? বাবু যে আমাদের সাক্ষাৎ শিবঠাকুর |

সে ওরা সবাই-_এঁ বরকন্দাজটা অবধি। শিবঠাকুরেরা ঢোল বাজিয়ে জমি নিলাম করেছে, ঘাড় ধাক। দিয়ে ছু-পুরুষে জমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে সেই দিন থেকে তোমার মাথাধরা আর ছাড়ে না। তুমি বল না, কিন্তু আমি সমস্ত শুনেছি, সমস্ত জানতে পেরেছি

সৌদামিনীর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল . নটবর মৃছু কে অপরাধের সরে বলল, তার আর কি বলব বউ। ওদের দোষ কি, তিন তিনটে বছর মালখাজনা পায় নি__

সৌদাখিনী আগুন হয়ে উঠল।

ওরা খাজন] পায় নি, আর তুমি এই তিন বচ্ছর দিন নেই, রাত নেই--তিল তিল করে জীবন দিয়েছ, তুমি কি পেয়েছ শুনি ?

নটবর বলল, ঠাণ্ড| বউ, তুই একেবারেই আস্ত পাগল। খাজনা না পেলে ওদের চলে ! বুড়ো-কর্তা কত টাকা দিয়ে বিষয় করে গেছেন__ 'ছোটবাবু আজও বলছিলেন, সে টাকার স্থদ পোষাচ্ছে না।

১১

আর, আমার বুড়ো শ্বশুর & আবাদ করতে সাপের কামড়ে মরেছেন, তার ছেলেপুলের পেটে দান! পড়ছে নাঁ_সেটা কিছু নয়?

অবোধ চাষার ঘরের বউ--নটবর যা বলেছে, পাগলই ঠিক! এই কথাটা কিছুতে বোঝে না, লাঙ্গল টানতে টানতে গরু-মহ্ষও তো কত মুখ থুবড়ে মরে যাঁয়! মানুষ সাপের কামড়ে মরেছে, জরে ওলাউঠায় গঙ্গপালের মতো মরেছে, বাঘ-কুমীরের পেটে গেছে--আবার নৃতনের দল এসেছে, যুগের পর যুগ চলেছে, বন কেটে জনপদ হয়েছে, শশ্যশালিনী পৃথিবী হাসছে। ধাঁদের এই পৃথিবী, রাজ্য দেখতে তীঁরা মাঝে মাঝে শুভ পদার্পণ করেন, রাজ-কাছারিতে উৎসব পড়ে যায়, আলো! জলে, মাছ আর মিষ্টান্ন দেশদেশান্তর থেকে ভারে ভারে উদয় হয়, শতজনে তটস্থ, তিলমাত্র ক্র যেন না ঘটে !...কবে কোন্থানে কে মরেছিল, কে তার ইতিহাস মনে রেখেছে--আর তার দরকারই বা কি! |

প্রকাণ্ড দিন এবং তারও চেয়ে মন্থর চারিপ্রহর রাত্রি কেটে যায়, নটবরের কাজকর্স নেই। বিলের মধ্যে কেবল তার ক্ষেতটাই ফাকা যখন-তখন সে আলের উপর গিয়ে বসে, বুকের মধ্যে হু-ু করে। ওদের সব রোয়৷ হয়ে গেছে, এমন গোন আজ কত বছর হয়নি! দেবরাজ অঝোর ধারে জল ঢালছেন, বৃষ্টির মধ্যে রিমঝিম রিমঝিম বাজনা বাজে” গাছপালা মাঠ-ঘাট উল্লাসে সবাই মিলে গান ধরে, বীজতলায় ধানের চারা দুষ্ট ছেলের মতো! বৃটিতে বাতাসে দাপাদাগি করে হতভাগার! বলছে যেন, নিয়ে যাও গে! আমাদের বড়-বিলের মাঝখানে দুপুরের কড়কড়ে রোদ পড়বে মাথার উপর, চারিদিকে জল থৈ-ৈ করবে, দু-ক্রোশ পীঁচ-ক্রোশ থেকে বাদল। ছুটে আসবে, দেয়! ঝিলিক দেবে, কত আমোদ ! তার লাঙ্গল-বলদ৪ যেন নিঃশব্দে কথ! বলে, তার শৃন্তক্ষেত হাতজোড় করে চেয়ে থাকে".

১২

এমনি সময়. এক-একদিন নটবর ভাবে, পাগলী-_-সৌদামিনীর কথাগুলো জমি চষতে দেবে না:'হঃ, বললেই হল ! আমার বাবা মরেছে সাপের কামড়ে-_যে ক'টা ধান ছিল পেটে না খেয়ে বীজতলায় ছড়িয়েছি, জমি দেবে না| তো! এদের জায়গ! দেব কি মাথার উপর ? কেন দেবে না?

আবার একদিন সে কাছারি গিয়ে একেবারে কেঁদে পড়ল!

নায়েব মশায়, আর যে বাড়ি থাকতে পারি নে-_

হল কি?

ফাকা ক্ষেত, দাওয়ায় বসলে দেখা যায়। থাকি কি করে? 'হুকুম 'দাও-_রুয়ে ফেলি। ফসল ন! হয় কাছারির গোলায় উঠবে

ছোটবাবু নেই, আমার হুকুমে হবে কি? আসছে, সদর থেকে পাক। হুকুম আসছে

তারপর প্রায় রোজই নটবর হাটাহাটি করে।

চোখের উপর চারাগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে-_তুমি যে বলেছিলে বাবা, উপায় একটা হয়ে যাবে।

নায়েব অভয় দিয়ে বলেন, হবে বলেছি যখন- উপায় হবে না? ব্যস্ত হৌস নে নটবর, পাক] হুকুম এল বলে।

অবশেষে হুকুম এল-__পাঁকাই বটে। আদালতের ছাপ-মারা নী সকালবেলা উঠে দেখে, বীজতলায় গরু পড়েছে

হোই গো, কি সর্বনেশে কাণ্ড গে!

বাক নিয়ে তাড়া করতে গরু পালাল, এগিয়ে এল চরণ ঘোষ

গরু তাড়াও কেন রে, মোড়ল? বারে! টাকা গুণে দিয়ে বন্দোবস্ত 'পেয়েছি। |

বন্দোবস্ত? নটবরের চক্ষু কপালে উঠল।

মাণিক বরকন্দাজ দখল দিতে এসেছিল, সে-ই সমস্ত বুঝিয়ে দিল।

১৩

জমি নিলাম হয়েছে, তাতে খাজনা সব শোধ হয় নি। তাই বাঁজতলার ধানচার! ক্রোক হয়েছে। চরণ ঘোষ জাতে গোয়।লা--গরু-বাছুর অনেক ;. গরুর খোরাকি কম পড়ে গেছে, তাই কাছারি থেকে বীজতলার বন্দোবস্ত নিয়ে গরু নামিয়ে দিয়েছে

ভাল, ভাল। নটবরের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। বলতে লাগল, তোমাদের আক্কেল ভাল বটে মাণিক-ভাই। কোন চাষার সঙ্গে বন্দোবস্ত করা গেল না বুঝি ! তবু আমার ধানচার1 গরুর পেটে যেত না --ভূঁয়ে ঠাই পেত।

মাণিকের অনেক কাজ, হাসতে হানতে সে চলে গেল। চরণ ঘোষের দিকে নটবর গজ'ন করে উঠল, গরু নিয়ে চলে যাঁও, ভাল হবে না বলছি__

চরণ বলল, টাকা কি আকেল-সেলামি দিয়ে এলাম ?

নটবর অধীর কে বলতে লাগল, ধান গরু দিয়ে খাওয়াবে, চাবার ছেলে হয়ে চোখে তা দেখতে পারব না--পারব না। গরু সরিয়ে নাও বলছি। না হয় আমিই উপড়ে দিচ্ছি, বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাওয়াও গে

অদূরে দেখা গেল, চরণের ছেলে কানগ-_-একটা ছুটো নয়-_ভাঁদের গোয়ালম্দ্ধ গরু নিয়ে আসছে তাই দেখে চরণের জৌর বাড়ল। কিন্ত নটবর একেবারে উন্মাদ হয়ে উঠেছে বীক নিয়ে সে সমস্ত ক্ষেতে ছুটাছুটি করে ধান মাড়িয়ে বীজতলা চষা-ক্ষেতের মতো কাদা-কাদ! করে গরুগুলো৷ ছোটে। নটবর চিৎকার করতে লাগল, বেরো- বেরে! আমার জমি থেকে-__

কানু ছুটে এল। বাপ-বেটায় এক সঙ্গে এসে নটবরের সামনে রুখে ঈ্াড়াল, খবরদার !

সঙ্গে সঙ্গে বীকের 'এক বাড়ি চরণের চোয়ালের উপর। চোখে অন্ধকার দেখল, বাব! গো--বলে জলকাদার মধ্যে সেইখানে চরণ বসে পড়ল। কানু টেচাতে লাগল মাঁণিক বরকন্দাজ বেশি দূর যায় নি-_ছুটতে

১৪

ছুটতে ফিরে এল, মাঠ থেকে চাষারা এল, গীয়ের মেক কেউ আর বড় বাকি রইল না। সকলের শেষে এলেন নায়েব মশয়ি, অনেকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বললেন, পিলীলিকার পাখা উঠেছে-_

কিন্ত আসামীর দেখা নেই। ঘর-বাড়ি অন্ধি-সন্ধি খাও: খু'জতে বাকি নেই-_গোলমালে কখন সে সরে পড়ে.হ, যেন পাখী হয়ে উড়ে গেছে।

উত্তেজনা আন্ফালন চলল রাত্রি অবর্ধি। ক্রমশ যে যার বাড়ি যেতে লাগল, চারিদিক নিজ'ন হয়ে এল। সৌদামিনী আজ সমস্ত দিন রান্না করে নি, এক জারগায় চুপটি করে বসে সকলের গালি শুনেছে আর কেদেছে। গভীর রাতে টেমি জলছিল। টেমির আলোয় ছায়া দেখে সে চমকে উঠল নটবর টিপিটিপি ঘরের মধ্যে এসে উঠেছে ফিসফিস করে সে বলল, চরণ কেমন আছে রে বউ?

ভাল। একটু চুপ করে থেফে সৌদামিনী বোধ করি উদ্যত অশ্রু রোধ করল। বলল, ভাল ন! থাকলে কি অমন বীধুনি-আট গালি- গালাজ বেরোয় ?

নটবর একটা স্বস্তির শিশ্বীস ফেলল।

সমস্ত চরণের ভিরকুটি। ছুতো ধরে পড়ে ছিল, আমি তখনই জানি

সৌদাঁমিনী বলল, তা! বলে নায়েব ছাড়বে না। থানায় গেছে, কাল তোমার কোমরে দড়ি দিয়ে নিয়ে যাবে। আর বলেছে, ঘরের চাল কেটে. বসত ওঠাবে-_

মুখখানা সান করে নটবর বলতে লাগল, কেন ছাড়বে? স্থবিধে পেলে কে কাকে ছাড়ে বল্‌? একট! ফ্যাসাদ বাধলে ছু-চার পয়সা পাওনা- থোওনাও তো৷ রয়েছে! তারপর সে বলল, বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে, কিছু ভাত- টাত আছে রে বউ?

১৫

ডা ভাত তো নেই-_রাধার সম্ভাবনাও নেই; উচ্্ন

ভেঙে হাড়িকুড়ি ভেঙে টাল-ডাল ছড়িয়ে তারা প্রতিশোধ নিয়ে গেছে।

উঠে দাড়িয়ে সৌদামিনী নটবরের হাত ধরে টানল।

চল, চলে যেতে হবে এখান থেকে--

নটবর একটু কা্ঠ-হাসি হাসল। মেয়েমান্ুষ, তায় বয়সে কত ছোট -__এইতো মাত্র ক-ব্ছর আগে এই সংসারে এসেছে কিন্তু সৌদামিনীর মুখের দিকে. তাকালে নটবর প্রতিবাদের ভরসা পায় না। একটু ইতস্তত করে বলল, তাই চল্‌। জমি যখন দেবে না_-চল্‌ তোর পিসের বাড়ি যাই তবে। পাইকঘেরির বন কেটে নাকি নতুন আবাদ করবে শুনছি। |

যা কিছু সামনে পেল পুটুলি বেঁধে তারা কাধে নিল। ক'পা গিয়ে বধূ থমকে দীড়াল।

কি?

টেমিটা জলছে যে!

নটবর তাচ্ছিল্যের ভাবে বলল, থাকগে, কি হয়েছে -জলে জলে আপনি নিভে যাবে

কিন্তু সৌদামিনী মান শুনল না। ঘরে ঢুকে জলন্ত টেমি নিয়ে ক্রুতপদে বেরিয়ে এল। এসে সেই টেমি ধরল চালের কিনারায়। নৃতন ছাওয়া ঘরের চাল রাতের অন্ধকারে ঝিকমিক করছে। চালে আগুন ধরল। নটবর ছুটে এসে বলে, করলি কি! ঘরে আগুন দিলি, কি সর্বনাশ করলি বউ!

সৌদামিনী হেসে উঠল। আগুন দাউ-দাউ করে ওঠে-_হাসি তার 'আরও উগ্র হয়। বলে, বয়ে গেল--বয়ে গেল। আমাদের কি-_যাদের জিনিষ তাদের পুড়ছে__তাদের সর্বনাশ

১৬

টেমিট! সে ছু'ড়ে ফেলে দিয়ে নটবরের হাত ধরে বাঁধের উপর দিয়ে ছুটল। নটবর আর ছুটতে পারে না।

থাম্‌, থাম্‌__-ওরে বউ, তুল-পথে চললি যে! পিসের বাড়ি কি এইদিকে?

না, যমের বাড়ি।

বালাই ষাট নটবর একটু রাঁসকতার চেষ্টা করল। তোর যে কত সাধ, বউ এই বয়সে__-এত সকাল সকাল সেখানে যাবি?

সৌদামিনী বলল, হা, যাব। গিয়ে সেই পোড়া বিধাতাকে জিজ্ঞাসা করব, পৃথিবী যদি বাঁটোয়ারা করে দিয়েছিস__-তবে আমাদের সেখানে পাঠাস কি জন্যে?

সাইবাবার গণ্প

এরা সব খড়ের টুকরো, হাওয়ায় এলোমেলো ওড়ে.'.তারপর একসময় মাটিতে পড়ে যায়, জলে কাদায় পচে মাটির সঙ্গে মেশে, পৃথিবী উর্বর! শশ্যশালিনী হয়, তোমাদের স্থুখ-সমৃদ্ধি উছলে ওঠে।

এমনি ছু*টি খড়ের টুকরো! একবার কলকাতা শহরে এল। দূরতম পাড়াগায়ে কোথায় কি ভাবে ভাইটি কলেজে পড়াশুনা করত,__আর বোন বাড়ি বসে সংসার দেখত, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করত, ভাব করত, জোর করে বিগ্ঠার ভাগ একটু-আধটু আদায় করত, সে কথায় দরকার নেই। এই আজ সকালেও আমার স্ত্রী সব গল্প করছিল-_ তারও অবশ্ঠ শোনা গল্প। মোটের উপর ছুটি ভাই-বোন শেষ পর্যন্ত

১৭

(পৃথিবী)--২

শহরে এসে পৌছল। শিয়ালদহে নেমে কমলা বলল, উঃ, কত গাড়ি আর কেমন সব বাড়ি! গীয়ের মুখে লাখি মেরে চলে এলাম দাদা, আর যাচ্ছি নে |

প্রফুল্পর বুদ্ধি আছে, অনেক দেখেছে, অনেক শিখেছে সে বলল, তো! আমাদের নয় বোন,_কিচ্ছু আমাদের নয়। চল্‌ না--দেখৰি কোথায় গিয়ে উঠি__

উঠল একট! গলির মধ্যে নিচের তলার ঘরে।

কমলা তাতে দমে না, স্ফৃতি আরও বেড়ে যায়। বলে, মাগো» কি করে যে থাকতাম সেখানে ! প্যাচপেচে কাদা আর বিশ্রী জঙ্গবল। শোন দাদা, আমি সেলাই শেখাব, বাজনা শেখাব, আর পার তো৷ ছোট-খাট একটা মাস্টারি জুটিয়ে দ্িও--.

গ্রফুল্ল ঘাড় নেড়ে বলে, অত সহজ নয় রে বোন। আমাদের মতো! আরও হাজার ভিখারি বড়লোকের আস্তাকুড়ে হাত বাড়িয়ে আছে-_

কমলা কানই দেয় না। সে বলে চলেছে, আমি টাকা আনব-- আর তুমি কাগজে কাগজে কবিতা লিখবে, কত নাম বেরুবে, চারিদিকে জয়-জয়কাঁর পড়ে যাবে ।.*"হাসছ যে, মণি-দাদা! কেন মেয়েমাজুষের টাকা রোজগার করতে নেই নাকি?

বোনের কল্পনা-গ্রবণতায় প্রফুল্পর মজ! লাগে অবশেষে নিজেও যোগ দেয়, তাঁর উৎসাহ ভেঙে দিতে মন. সরে না। ১হাঁসতে হাসতে সে বলে, ব্যবস্থা ভাল। পাছে গান শিখতে বলি, আগে থেকে তাই মতলব অশটছিস। চাকরি করব আমি তোকে মস্ত বড় কালোয়াত করব। অমন গলা যদি আমার থাকত, কি করতাম জানিস ?

_ কমলা বলে, কি করতে বল না

চোখ-মুখ ঘুরিয়ে প্রচুল্ল বলে, সে কত কি ব্যাপার!

১৮

একটাই বল না।

দিন-রাত গান করতাম। গান শুনে গোলাপ ফুটত,. টুনটুনি পাখী জানালার ধারে ভিড় করত-_-

কমলাও তেমনি স্থরে বলতে লাগল, গরুগুলো হাম্বারবে দেশ ছেড়ে পালাত, বস্তির মোটা মিস্ত্রিটা ঠ্যাঙা নিয়ে ছুটে আসত বলতে বলতে সে আর এক কথা পাড়ল, দাদামণি, টুনট্ুনির মতো! একট! বৌদিদি এনে দিতে হবে কিন্তু ছু-জনে মিলেমিশে ঘর-সংসার করব-_একা একা আর পারি নে।

প্রফুল্ল বলে, রোদ, তার আগে মোটা মিস্ত্রির মতে! একটা ঠ্যাঙান্ডের জোগাড় দেখি-_তোকে যে জব্দ রাখতে পারবে

ছোট ঘরখানি ভরে হাসির তুবড়ি ফোটে

কমল! মনে মনে বলে, তা বই কি! তুমি আমার তেমনি ভাই কি

না-্যাঙাড়ের হীতে দেবেই বটে ! তোমার মনের ইচ্ছে বুঝি গে বুঝি__

কলিকাতা শহর--কাঠার মাপে জমির হিসাব হয়, ঘরের গহ্বরে একসঙ্গে দু-হাঁজার মানুষ সিনেমার মজা! দেখে, আলোর ভিড়ে চাদ দেখা যায় না। তোমাদের এই শহরের অনেক-_অনেক দূরে সুন্দরবন নোন। জলের বড় বড় গাউ--বনকেওড়া, ঝাউ গর্জন গাছের গোড়া অবধি জোয়ারের জল ছলছল করে। গাছে গাছে বানর, নিচে হরিণের পাল দিন-ছুপুরে হঠাৎবাঘ ডেকে ওঠে, ঝামটি বন থেকে বেরিয়ে কখন বা গম্ভীরভাবে ফাকায় বেড়িয়ে বেড়ায়, দোয়ানির ধারে নিঃশস্কে নিদ্রা যায়।

১৪

এরই মধ্যে এক-একটা বড় গাছের তলায় আইটের উপর স্াইবাবাদের আসন। এমনি এক সীইবাবার গল্পই বলব...সবুর, ভাই সবুর-_

আকাশের তার] বন্ধন পাতালের বালি বন্ধন বাঘ বন্ধন--ভালুক বন্ধন-_ সাপ বদ্ধন- শুয়োর বন্ধন-_ দোহাই ম1 বনবিবি, দোহাই দক্ষিণরায়-__ বাঘ, সাপ, পোড়ো, দানো__বন্ধন ভেদ করে সামনের কাছে কাঁরও যাবার হুকুম নেই। সাাইয্বের মন্ত্রে বাঘের মুখ বন্ধ হয়ে যাঁয়; সাতার কেটে সাই গাঙ-খাল এপার-ওপার করেন, সাধ্য কি যে কুমীর-কামট বিশ হাতের মধ্যে আসে! কাঠ কাটতে, মোমমধু ভাঙতে কিম্বা শিকার করতে যারা বাদায় ঢোকে-সকলের আগে সাইবাবার খোজ করে, গাছতলায় পূজা দেয়, মুরগী মানত করে--তারপর নির্ভয়ে ছুর্গম জঙ্গলের দিকে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দেয়। তখন আর কেউ কিছু করতে পারবে না। তবে মুশকিল এই যে, বাবাদের আসনের ঠিক নেই। এ-বছর এই এখানে, আবার ও-বছর আর যে কোথায় গেলেন--কোন খোজ পাওয়া যায় না। গভীর রাতে সুন্দরবন থম-থম করে; হরগজা-বাড়ের নিচে দিয়ে ভাটার জল নেমে যায়; বনভূমির অন্ধকার রহস্ত-নিবিড় হয়ে ওঠে মাঝিরা ওদিকে চাঁপান সেরে রাম্না-বান্নার উদ্যোগ করে, বুকের ভিতর কিন্তু গুর-গুর করতে থাকে হঠাৎ হয়তো ঘন জঙ্গলের মধ্য থেকে শোন! গেল-_কু-কু-কু। ভয় নেই, আর ভয় নেই--কাছেই কোন সাইবাবা আছেন !..'স্তনবে ভাই, এই সীইবাবার গল্প? সবুর !

স৩

আমার সঙ্গে প্রুল্পর পরিচয় হরিকেশব দত্তর বাঁড়িতে। হরিকেশব আমাদেরই পাড়ার লোক..-আগে কাঠের গোল! ছিল, তাতে কিছু পয়সা হয়েছে, তারপর এই ক-বছর স্বন্দরবন অঞ্চলে অনেকটা জমি ইজারা নিয়ে ধানের আবাদ করছেন। এ'ত ভদ্রলোক একেবারে লাল হয়ে গেছেন। তেতলা বাড়ি উঠেছে, বড় মোটর কিনেছেন, আবার নামের সঙ্গে কেউ যদি “জমিদার লিখতে স্ুলে যাঁয়, মনে মনে তিনি চটে যান। সম্প্রতি হরিকেশব আধুনিক হবার চেষ্টায় আছেন। মেয়েকে লেখাপড়। শেখান হচ্ছে_কলেজে দিতে সাহস হয় না, তার ধারণা কলেজি মেযে কেউ বিয়ে করতে চায় না বাড়িতে পড়াবার বন্দোবস্ত হয়েছে, প্রফুল্ল এসে ছুই বেলা পড়িয়ে যাঁয়। আবাদ অঞ্চলে প্রফুল্লর বাপের সঙ্গে হরিকেশবের খুব জানাশোন। হয়েছিল, সেই স্বাদে প্রফুল্পর সঙ্গে পরিচয়। শোভন। প্রফুলকে দাঁদা বলে ডাকে ইদানীং কমলাও এদের বাড়ি আসা- যাওয়া করছে, শোভনার সঙ্গে তার খুব ভাব; যখন-তখন শোভন! নিমন্ত্রণ করে, না এলে রাগ করে-অভিমান করে; ভয় দেখায়, বাসায় গিয়ে হিড়-হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে এঁ ভয়ে কমলা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে, এদো- বাসার এদের সে নিতে চায় না অগত্যা তাকেই যখন-তখন আসতে হয়।

গঙ্গায় বান ডেকেছে, গড়ের মাঠে জল উঠেছে। দত্তমশায় মেয়ে নিয়ে বান দেখতে যাচ্ছিলেন। আমার সঙ্গে দেখা, আমাকেও গাড়িতে ভুলে নিলেন। ঘোরাঘুরি করতে খানিকটা রাত হয়ে গেল। ফিরে এসে দেখা গেল, পলাতক ছাত্রীর অপেক্ষায় প্রফুল্ল তখনও বসে রয়েছে ; জানালা দিয়ে আকাশের মেঘপুগ্জের দিকে তাকিয়ে আছে। শোভনা খিলখিল করে হেসে উঠল, কি দেখছেন দাদা? স্বভাবের শোভা?

হু, ওতে পয়সা লাগে না।

২১

শৌভনা রাগ করে বলল, যখন-তখন আপনি পয়সার কথা তোলেন। মনের ভিতর কবিত৷ দাপাদাঁপি করছে-_সত্যি কথা স্বীকার করতে লাজ্জ হয় বুঝি ! |

্রফু্ হাসিমুখে বলল, তা-ও হতে পারে কারণ ওর সঙ্গে পয়সার সম্পর্ক নেই। কবিতা লিখতে পয়সা লাগে না, লিখলেও কেউ পয়সা দেয় না।

এই সব হচ্ছে, এমনি সময় আমি দততমশায় এসে পড়লাম। ধান-চাষ সম্পর্কে দত্তমশায়ের মতামত অন্রান্ত। এবং তিনি বিবেচনা করেন, সাহিত্য সম্পর্কেও ঠিক তাই। দত্তমশায় প্রতিবাদ করে উঠলেন, কেন? কেন? কবিতা ভাল জিনিষ _আমার তো খুব ভাল লাগে খাওয়ার পর আমি তামাক খাই নে, শুয়ে শুয়ে কবিতা শুনি। খুকী পড়ে শোনায়

প্রফুল্ল আমি দু-জনেই হেসে উঠি। প্রফুল্ল বলে, বেশ করেন স্যর। তামাকের পয়সা বেঁচে যায়; ঘুমও আসে বিন! পয়সায় ঘুমোবার এমন ওষুদ আর নেই।

বিনা পয়সা কি বল হে? কবিতায় বুঝি পয়সা হয় না? রবি ঠাকুরের গীতগোবিন্দ যে নোবেল সাহেব আড়াই লক্ষ টাকায় কিনে নিলেন। তাই দিয়ে পাবনার জমিদারি কেনা হল। বুদ্ধির তুল__জমি- দারি করতে হয় ওখানে! পল্মার ভাঙন লেগে আছে, আজ যেখানে মাটি, কাল সেখানে অথই জল। সুন্দরবনের দিকে যাওয়া! উচিত ছিল

এই রকম উচ্চাঙ্গের আলোচন| চলত হরিকেশবের সঙ্গে। এমনি লোক মন্দ নন; এক দৌষ, বড় টাকার দেমাক করেন_-তিনি অনেক রোজগার করেছেন এবং এখনও করছেন, এই কথাটা সকলকে পাকে- প্রকারে জানিয়ে দেওয়া! চাই। একদিন বললেন, পয়সা? পয়সা রোজগার

১৪

কর! কঠিন কি হে-_উড়ে বেড়াচ্ছে পয়সা, ধরে নাও। আমি যখন প্রথম কলকাতায় আসি--

প্রফুল্ল বাধা দিয়ে বলে, সে অনেক কালের কথ! স্যর, তখন হয়তো উড়ে বেড়াত। এখন আপনার ধরে নিয়ে সব ব্যান্কে আটকে ফেলেছেন। সেখানে ছা-বাচ্চা হচ্ছে।

টাকার বাচ্চা? হা-হা হাঁ | হরিকেশব খুব হাসতে লাগলেন।

আমি বললাম, বুঝলেন না? টাকার স্থুদ হয়, সেই কথা বলছেন__-

প্রফুল্ল বলতে লাগল, সত্যি কথা স্তর, অতি চমৎকার জিনিয টাকা। ব্যাঙ্কে ফেলে রাখুন, রেখে নিশ্চিন্তে ঘুম দিন__ও জিনিষ আপনা থেকেই বেড়ে চলবে ; আমাদের রক্ত খেয়ে বাচ্চায় বাচ্চায় অফুরন্ত হবে। ছু-হাতে উড়িয়ে বেড়ান, শেষ হবে ন1।

এসব কথা বলতে বলতে-_ আমি দেখেছি, প্রফুল্ল যেন আর এক মান্য হয়ে যায়। শোভনার দেখে ভয় করে, কষ্টও হয় বড়। নে একটি কথাও বলে না, কিন্তু মনে মনে অনুভব করে, কোথায় কি সব মর্মান্তিক অত্যাচার হচ্ছে _মনের মধ্যে যার পৃথিবীদাহী আগুন, তাকে যেন জবরদন্তি করে গ্রামারের তুল কাটতে বসিয়ে দেওয়! হয়েছে

প্রফুল হেসে ওঠে। জানেন স্যর, জীবনে আমি ঘি খাই নি। জগতে ঘি নামে একটা!

ভোজ্য বস্ত আছে, আমার কাছে তা মিথ্যা হরিকেশব বললেন, ঘি খাও নি, বল কি! পাঁড়াগীয়ের ছেলে--আর যাই হোক, সেখানে তো৷ ক্ষেতের ধান, পুকুরের মাছ, গরুর ছুধ__

ওসব কেতাবে আছে, স্বপ্ের কথা _দেশের মধ্যে নেই। কথাবাতার মাঝে অকস্মাৎ ছেদ টেনে প্রফুল্ল পড়বার ঘরে চলে যায়,

গম্ভীরভাবে একখানা বই টেনে নিয়ে বসে। আমার দিকে চেয়ে হরিকেশব বলেন, ছোকরা পাগল !

অনেক রাত হয়ে গেছে। যাবার জন্য প্রফুল্ন চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়েছে শোঁভনা বলল, একটা কথা বলি দাদা, আমার জন্মদিন আসছে বুধবারে। আপনাদের আসতে হবে |

ঘি খাওয়াতে চাও? প্রফুল্ল হেসে প্রশ্ন করল।

শৌভন! রেগে আগুন। তাই কি খাবেন আপনি? পাত্রে দিলে ফেলে দেবেন। গরিবানা৷ আপনাদের বিলাস। দেখুন__ আপনার য! অহঙ্কার, লক্ষণতি কোটি-পতিরও তেমন নয়।

রাগ দেখে প্রফুল্পর হাঁসি বেড়ে যায়। বলে, অহঙ্কার করি নে, কিন্তু দারিদ্রকে অপরাধ বলেও মনে ভাবি নে। দেখ শোৌভনা, আমার বাব! এক আবাদের কাছা'রিতে পাইকগিরি করতেন-_-

শোভন! বিস্মিত হয়ে বলে, পাইকগিরি কি বলেন ! শুনেছি তিনি কোথাকার বড় নায়েব ছিলেন

প্রফুল্প বলল, তোমার বাবার মুখে শ্ুনেছ লোকের কাছে বাবা এঁ বলতেন বটে, নইলে মান থাকে না। নে যাই হোক, আমি বার দুই-তিন গিয়েছি আবাদে। লকগেট আছে, খুলে দিলে আবাদের সমস্ত জল বেরিয়ে যায়। তোমার জমিতে তুমিযত খুশি আপি বাধ, জল আটকাতে পারবে না। আলি ভাঙতে না পারে, চু'ইয়ে চুইয়ে জল বেরিয়ে যাবে যে জল থাকে না, এতে চাষার কি দৌষ ?...আমাদের গরিব হতেই হবে, না খেয়ে মরতে হবে, এতে আমার কোন দোষ নেই, এর অন্য মাথা নিচু করে থাকবারও কারণ নেই। বরঞ্চ মাথা উচু করে পার তে। এঁ লকগেটটা বন্ধ করগে, জল যাতে শুষে বেরিয়ে না যায়

শোভন! খানিক গভীর হয়ে থাকে শেষে বলে, অত কথা আমি বুঝি নে, মাস্টারমশীয়।. তবে এইটে জেনে রাখুন, আপনারা না এলে আমি বই ছি'ড়ে দোয়াত ভেঙে তচনচ করব

তারপর আবদারের স্থরে বলতে লাগল, বেশি লোক হবে না, ভয় নেই। গুটি পাচ-ছয় বন্ধুকে মাত্র ডেকেছি। আমার জন্মদিনে আপনারা আসবেন না, সে কি হয়?

প্রফুল্ল ঘাড় নাড়ল।

খুশি হয়ে শোভনা বলল, আর কমলা-দি-_তাকেও নিয়ে আসবেন। বুঝলেন তো? নইলে গান করবে কে?

প্রফুল্ল বলল, আনতে হবে কেন? সে বুঝি পথ চেনে না__

অভিমানে মুখ ভারি করে শোভনা বলল, ওঃ, আপনি কিছু বলবেন না_এই তো?

হাসতে হাসতে প্রফুল্ল বলল, বেশ, বলব। বরঞ্চ আমি ভাবছি, কমলাই এসে গাঁন-টান করুক, আমোদ-স্ফৃতির মধ্যে আমায় মোটে মানায় না। তা ছাড়া একটু কাজও আছে সোদিন__-কলকাতায় থাকা 'মুশকিল হবে-_

শোভন! চুপ হয়ে রইল

প্রফুল্ল বলল, কি বল?

শোভনা বলল, আমি ভাবছি, আমারও এদ্রিন কাজ আছে-- কলকাতার বাইরে যেতে হবে

কোথায় ?

হাসি চেপে কৃত্রিম গান্তীর্যের সঙ্গে শোভনা বলল, বাবার সঙ্গে সুন্দরবনের চকে

কেন? লকগেট দেখতে ?

উহু, বাঁনর-হন্থমান দেখতে বলতে বলতে সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

হাসিতে গুম্ট পরিষ্কার হয়ে গেল

প্রফুল্প বলল,.সেট! কি এখানে থাকলে হবে না? কই আর হবে! মানুষ বেছে বেছেই যে বলা হচ্ছে__বানর-

হনমানদের নেমন্তন্ন বাদ-_সত্যি বাদ-_দয়া করে আসেন তো! দেখতে পাবেন।

তবু প্রফুল্ল এল না। শোভনা খুব ছুঃখ পাবে, সে জানে- কিন্তু বড়লোকের পার্টি সে বরদাস্ত করতে পারে না। বিনিয়ে-বিনিয়ে-বলা কথা, ওজন-করা হাসি, ঘাড় বেঁকিয়ে মিহিস্থরের অনুরোধ'*এরা যেন তাসের দেশের মানুষ_-যে পৃথিবী নিরন্নের অশ্রুতে জীবন্ত, এরা যেন সেখানকার কেউ নয়।

কমলা এসেছে শোভনা ছুঃখিত ভাবে বলল, আপনার দাঁদা!?

পরে আসবে, নিশ্চয় আসবে

শোভনা! হঠাৎ বলল, আচ্ছা কমলা-দি, আপনারা ছুটি তো ছুই রকমের মান্য অথচ ভাই-বোনে এমন ভাব বুঝি জগতে নেই-_

কমলা বলল, কোন্‌ শত্র রটনা করেছে শুনি ?

শত্রু নয়, মিত্রেরাই বলে থাকেন। আপনি বলেন তাঁর কথা, তিনি বলেন আপনার কথা।

আমরা বলেছি যে আমাদের মধ্যে ভয়ানক ভাব ?

না। বরঞ্চ বলেন, রাতদিন খিটিমিটি। কিন্তু আপনাদের চোখ- মুখ বলে-"কণ্ধন্বর বলে দেয়--

বলে নাকি? ত্রাতৃগর্বে কমলার বুক ভরে উঠল। তার দাদা জীবনে কত আঘাত পেয়েছে, কত নির্যাতন সয়েছে, কোনদিন কেউ, সহান্ভূতি দেখায় নি- প্রথম জীবনের আমুদে কবি-্বভাব দাদা আজ বিশ্বের আনন্দরূপ দেখতে একেবারে ভূলে গেছে

১৩,

শোভন! বলতে লাগল, আচ্ছা কমলা-দি, আপনার! দু'জনে এক সঙ্গে কোথাও যান না কেন?

আকাশে চাদ-হূর্য এক সঙ্গে থাকে না কেন, বল তো বোন? আমি আসতে দিই না-_-তা৷ হলে তার আলোয় আমি যে একেবারে ঢাকা পড়ে যাব।

হিমান্দ্রি মিটার কেমিস্ট, জামে নি-ফেরত--এই বাড়িতে সম্প্রতি একটু অধিক আনাগোনা করছে তার প্রতি হরিকেশবের বিশেষ পক্ষপাত আছে। কমলার গান শুনে মিটার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করল, জিনিয়াস!

তারপর একটু ফাকায় পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কলেজে পড়েন বুঝি মিস রায়? |

বেথুনে। এমন মিথ্যাকথ! কমল! জীবনে এই প্রথম বলল

হস্টেলে থাকেন?

না, বাড়িতে।

বাড়ির কথা কমল! ইচ্ছা করেই বেশি বলল না। বলল, আমি এখানে প্রায়ই আসি। শোভন৷ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু

হিমাদ্রি বলল, আমাকেও খুব আসতে হয়। নানা রকম বিজনেস__

কমলা হাসল বলল, একটা অবশ্ঠ জানি, সেটি আমার বন্ধুর সঙ্গে

হিমাদ্রি প্রতিবাদ করে বলল, অনুমান ভুল হয়েছে মিস রায়। বেশি হচ্ছে আপনার বন্ধুর বাবার সঙ্গে সুন্দরবনের কাঠে ম্যাচ-ফ্যাক্টরি চলতে পারে কিনা, তারই এক্সপেরিমেণ্ট হচ্ছে

শোভনা এল, এসে বাহু-বেষ্টনৈ কমলাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, কমলা-দি ভাই, ওপরে চল। তোমার আর একটা গান শুন্বার জন্য ম! ওরা পাগল হয়ে আছেন। হিমাদ্রির দিকে চেয়ে চপল কণ্ঠে বলল, পালাবেন না কিন্তু মিস্টার মিটার, আমরা এক্ষুণি আসছি

একদিন কমল! বলল, দাদা, আজ সিনেমায় যাচ্ছি। আমি, শোভন আর হিমাব্রিবাবু_- |

এক মৃহূ্ত শাস্তদৃষ্টিতে চেয়ে প্রফুল্ল বলল, বোন, দেশে ফিরে যাই চল্‌__এ জায়গা আমাদের নয়।

তা বই কি! আমাদের জায়গা কিনা দেখো এখন। তারপর হেসে উচ্ছুসিতভাবে কমল! বলতে থাকে, পাড়াগীয়ে গিয়ে কি চতুভূ্জ হবে? কি করবে সেখানে?

সবাই যা করে-_দলাদলি পরচর্চা করব, তাস-দাবা খেলব, যাদের অন্ন নেই, অন্র-যোগাড়ের উপায়ও নেই-__-তেমনি দশজনে যা করে থাকে সেখানকার ছুঃখ এত নিদারুণ নয়। |

প্রফুল্ল বেরিয়ে গেল। একটু পরে একগাদা প্রসাধনের জিনিষ-পত্র 'নিয়ে উপস্থিত। কমলা আশ্চর্য হয়ে বলল, এসব আনতে কে বলেছে?

বল নি। কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছিল বোন, অবস্থা বিবেচনা করে বলতে পার নি।

কমলা বলল, হ্যা, তুমি দৈবজ্ঞ ঠাকুর হয়েছ, মনের কথা৷ গুণে বের করতে পার-_

প্রফুল্ল হেসে বলল, একটু একটু পারি বই কি। এই যেমন, আমার বোনটির মন লোনার হরিণের পিছনে ছুটেছে।.."কিন্ত সাবধান, সাবধান ! সোনার পোষাক্টা সরিয়ে দিলে দেখ! যাবে, হরিণ নয়-_ওরা রাক্ষস

এই প্রসঙ্গ কমলা এড়িয়ে যেতে চায়। জিজ্ঞাসা করল, এত কিনবার টাকা কোথায় পেলে? তোমার জুতো! ছি'ড়ে গেছে, নতুন জুতোর কথা বলছিলে»__সেই টাকায় বুঝি ?

প্রফুল্ল বলল, জুতো কি হবে? গ্রামে যাচ্ছি, সেখানে জুতো লাগে না

কমল। রাগ করে বলল, তোমার এসব আমি ছুড়ে ফেলে দেব।

কিন্ত ফেলল না, হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিনিষগুলো৷ দেখতে লাগল! যখন প্রশংসার লোক জোটে, তখন বেশি করে প্রশংসা কুড়োতে লোভ হয় নাকার? মনে মনে ভাবে, আস্থক সেদিন-_দাদাকে এই রকম পথে পথে পৃথিবীর কুৎসা গেয়ে বেড়াতে দেব নাকি? সে আমি দেখে নেব।

দিন কয়েক পরে এক অঘটন ঘটল। প্রফুল্ল যথারীতি পড়াতে ঢুকছে» হরিকেশব প্থ আগলে ফ্াড়ালেন। রুক্ষকে বললেন, এই চৌকাঠ কোনদিন তোমরা পার হয়ো! না..তুমি না, তোমার বিদ্েধরী বোনটিও না। আজকে যাঁও-_কিন্ত এর পর দেখতে পেলে অপমান করব।

প্রফুল্ল থমকে দাড়াল, অবস্থাটা সে কিছু আচ করেছে ফ্াতে ঠোঁট চেপে মুহূত্তকাল সে সামলে নিল। তারপর হেসে বলল, তবু ভাল, অপমানটা আজকে মুলতুবি রাখলেন। সেজন্য কৃতজ্ঞ রইলাম।

শ্লেষ এত স্পষ্ট যে হরিকেশবেরও বুঝতে আটকায় না। বললেন» তোমাদের কুকুর-শিয়ালের কি গালিতে অপমান হয়,_পিঠে পড়লে তবে ।-"এখানে নয়, চৌকাঠের ওপারে ঈলাড়িয়ে যা হয় বল।

হরিকেশব কতকগুলে। টাকা ছুঁড়ে রাস্তায় ফেললেন। নিবিকারভাবে প্রফুল্ল কুড়িয়ে নিয়ে চলে গেল

এর পর একদিন কোথা থেকে এসে প্রফুল্ল জাম! খুলছে, বিবর্ণ মুখে কমলা বলল, দাদা, এই চিঠি-_

কিসের চিঠি রে?

নেমন্তন্নর |

বোনের দিকে চেয়ে আর কিছু না বলে প্রফুল্ন চিঠি পড়ল। শোৌভনার; দঙ্গে হিমাদ্রির বিয়ে হচ্ছে সপ্তাহ খানেক পরে।

কোথায় পেলি চিঠি? থতমত খেয়ে কমল! বলল, শোভন! দিয়েছে

মিথ্যে কথা বলছিস। তারা দেবে না__কক্ষণো দেবে না। চিঠিতে 'আর একবার চোখ বুলিয়ে প্রফুল্ল বলল, আর, তে। দেখছি হিমান্রি বাবুর তরফের চিঠি। তিনি দিয়েছেন?

তার কি সে সাহদ আছে?

রাগ করতে গিয়ে কমলা! কেঁদে ফেলল বলল, এখন পালিয়ে বেড়ায় দাদা, দেখাশুনা হয় না। আজ আমি নিজে চলে গিয়েছিলাম, এই চিঠি তার টেবিল থেকে চুরি করে নিয়ে এসেছি

ছোট মেয়েটির মতো কমলা বালিশে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাদতে লাগল।. তাঁর মাথায় হাত রেখে গন্তীর মুখে প্রফুল্ল বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে বলল, দেশে ফিরে যাই চল্‌, বোন__

যাব। বলে কমল! উঠে বসল।

এই রাত্রে--এখনই যাঁকিছু আছে, বেধে-ছে'দে নে।

কমল মাথা নেড়ে বলল, না দাদা, কদিন পরে। আমার ক'টা কথা আছে। ,

প্রফুল্ল বলল বাজে কথায় কি হবে? যা কঠোর সত্য, কথায় কি তার নড়চড় হয়? ওর! যে জাত আলাদ!।

কমল] বিস্মিত চোখে চাইল। বলতে লাগল, না, না-তুল শুনেছ দাদা, ওরাও কায়েত।

সে জাতের কথ নয়, বোন। ওরা বড়লোক, আমরা গরিব। ভেলে জলে মিশ খায়, কিন্তু ছুই জাতে মিশবার জো নেই।

১১৩

বলতে বলতে প্রফুল্র চোখ জলে ওঠে, কঠম্বরে আগুন ছুটতে থাকে বলল, ছোটবেল! থেকে দেখছি। এই কলকাতা শহরে এতদিন আছি, ছুয়ারে ছুয়ারে ভাড়া খেয়ে আসছি"'নেড়ি-কুকুরকে ওরা যে চোখে দেখে, গরিবদেরও তাই।

কিন্ত কুকুরও কামড় দিতে পারে, একথাটা ওরা ভুলে রয়েছে।

রোজ বিকাঁলবেল। বাড়ি থেকে ক'টা গলি পার হয়ে এসে রাস্তার মোড়ে কমলা ঘুরে বেড়ায়। লোকে লক্ষ্য করে, কত কি বলাবলি করে, কমল। ভ্রক্ষেপ করে না__অনেকক্ষণ ধরে পায়চারি করে। এই পথে হিমাদ্রির মোটর যায়। ক'দিন দেখতেও পেয়েছে গাড়িখানা। কমলা হাত উচু করে বলে, শোন গো, শোন-_গাঁড়ির স্পীড সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক রকম বেড়ে যায়, পেট্রোলের গর্জন ওঠে, সে শব্দে কোন কথ। কারও কানে ঢোকে না। কমলা বাড়ি ফিরে আসে, ফিরবার পথে কোন কোন দিন একটুখানি ঘুরে হিমাত্রির বাড়ির সামনে দিয়ে আসে, সেখানে আগের মতো অবাধে ঢুকতে পারে না। নেপালি দারোয়ান দরজায় বসে আছে কমলার মনে হয়, দারোয়ানটাও বুঝি তার দিকে মুখ টিপে হাসছে

প্রফুল্ল বলল, কাল কিন্তু মাসের শেষ তারিখ। পরশু সকালে বাড়িওয়ালা! জিনিষপত্তোর টেনে রাস্তায় ফেলে দেবে নতুন ভাড়াটে ঠিক হয়ে গেছে।

কালই যাব দাদ1।

পরদিন সমস্ত দুপুর কমল! জিনিষপত্র বীধা-ছাঁদা করল। তারপর সবচেয়ে ভাল যে শাড়িখানা তাই পরল, বেশ-বিন্তাসের যত কিছু ছিল সমস্ত নিয়ে আয়নার সামনে অনেকক্ষণ বসে বসে অনেক যত্বে সাজ-গোজ

৩১

করল। এমনই সুন্দর, _যাবার দিনে সে রাজরাজ্যেশ্বরী সাজল। তারপর; আসন্ন সন্ধ্যায় চলল সেই মোড়ের দিকে সামনে দেখে, সেই মোটর-__ ঝক-ঝকে নেভি-বু রঙ, ড্রাগনমুখো হর্ন_

দাড়াও গে ঈাড়াও, শোন একটা কথা _-

হিমাদ্রি চকিতে চোখ তুলল। চোখে আর পলক পড়ল না-_কি সুন্দর মুখখানি-_বিষাদ-মলিন, চমতকার! ্টিয়ারিং-চাকার উপর তার হাত কেপে গেল। কমল! ততক্ষণে গাড়ির ফুটবোর্ডে লাফিয়ে উঠেছে। বলতে লাগল, শোন, আমার কথার জবাব দিতে হবে। কেন তুমি এমন করলে? কি করেছি আমর! ?

জবাব দেবে কি, মুগ্ধ চোখে হিমান্ডরি চেয়ে আছে। সন্বিৎ পেয়ে শেষে বলল, ভিতরে এস, এই এইখানটিতে পাশে বস দ্রিকি-.-শুনছি-_

একটি কথায় কি হয়ে যায়, চীপাফুল থেকে কালসাপ গর্জন করে বেরিয়ে আসে। বলল, পাশে বসব? বুকের উপর দাড়িয়ে নাচব। অনেক সর্বনাশ করেছ আইন-আদালতে তোমাদের শান্তি হবে না। এবার নিজের হাতে শাস্তি দেব।

উন্মাদিনীর মতো! সে হিমাদ্রির টুটি চেপে ধরল। কেমিস্ট সাহেব মুহূর্তকাল হতবুদ্ধি হয়ে রইল, তারপর একসেলেটর চেপে ধরল। গাঁড়ি ছুটল। বাতাসের বেগে ছুটেছে _বৌ-৩-৩-ও স্পীভোমিটারে উঠছে ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ-পর্চান্ন _- | ধাক্কা মেরে হিমাদ্রি. কমলাকে ফেলে দ্দিল ফুটবোর্ডের উপর থেকে মনোরম সাজ-গোজ নিয়ে সোনার সবপ্নরাশি নিয়ে সুন্দরী মেয়ে পড়ল পথের কাদায়। বুকের উপর দিয়ে গাঁড়ির চাকা চলে গেল। একটা অস্প& গোঙানি, তারপর সব শেষ-_ ভলক্ষে ভলকে দিয়ে রক্ত উঠছে। ঘড়াং করে গাড়িটা থামল

৩৭

এক মৃহ্ত্ত। তারপর, চালাও_-চালাও। হিমানত্রি এদিক-ওদিক তাকায়, তীরগতিতে গাড়ি চলতে থাকে

অসংখ্য লোকের ভিড়, গাড়ির ভিড়। প্রছুলল এসেছে, তার চোখে জল নেই। অতিশয় শ্রান্ত ভাবে বোনের গায়ের কাপড়-চোপড়গুলা ঠিক করে দিচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে একজন বলে, মোড়ে মোড়ে এই রকম ব্াস্তায় বেরুলে শ্মশানের খরচ পকেটে করে নিতে হয়। আর একজন বলে, মোটর নয়, ছুশমন; রাগ ধেন আমাদের উপরই বেশি চড়বার টাকা নেই কিনা, তাই চাপা দেয়।

পথ-ঘাটের দুর্ঘটনার গল্প করতে করতে কৌতুহলীর দল এক আসে, এক চলে যায়।

পুলিশ বলে, মড়া পাবেন না তো! এখন পোস্ট-মর্টেমে যাবে। আপনি থানায় চলুন

কেন?

গাড়ি সনাক্ত করতে হবে আপনাঁদেরই দরকার |

উদ্ভ্রান্ত প্রফুল্ল বলে, আমাদের নয়__আমরা তো পোকামাকড় তবে তোমাদের আছে হয়তো আচ্ছ!, চল যাচ্ছি-_

তারপর মামলা-মোকর্দম! চলল মাস চারেক ধরে আদালতে টানা- হেচড়া__শেষ পর্যস্ত হিমাত্রি খালাস পেয়ে গেল বটে, কিন্তু গোলমালে অনেক পাক বেরিয়ে এল, অনেক পয়সা অনেকের পকেটে গেল। এই সব ব্যাপারে বিয়ে ভেঙে গেল, শোভনার বিয়ে হল পাড়ারই